সাড়ে সাত দশকে নানা বদলের মধ্যে দিয়ে ভারত আজকের চেহারা পেয়েছে। সেই বদল কিন্তু শুধুই রাজনীতির নয়। খাদ্যাভাস, সাজ পোশাকেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। আর দেশের সাংস্কৃতিক গতিময়তারই সাক্ষী থেকেছে এই বদল।
নানা সময়ে দেশে এসেছে একেক রকম বদল। ভারত বহু ভাষা-বহু জনজাতির দেশ হলেও, দেশের ফ্যাশন কিন্তু বহুলাংশে নির্ধারিত হয়েছে বিনোদন জগতের হাত ধরে, এ কথা স্বীকার করতেই হয়। বাংলায় অনেকটাই আধিপত্য থেকেছে বাংলা ছবির নায়ক নায়িকাদের পোশাক আসাকের। সর্ব ভারতীয় ফ্যাশনে যেমন বলিউডের ছায়াই সবচেয়ে বেশি।
গত শতাব্দীর পাঁচের দশক। ভারতের গায়ে তখনও সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির গন্ধ। দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত গোটা ভারত। তখনকার ফ্যাশনে যে খাদির আধিপত্য থাকবে, নতুন করে বলে দিতে হয় না। স্বাধীন ভারত, নেহরুর ভারত। সাজ পোশাক তখন বাহুল্য বর্জিত। খাদির পাঞ্জাবি। ছিমছাম শাড়ি সালোয়ার ছিল তখনকার ট্রেন্ড। আবার একই সঙ্গে ইওরোপিয়ান পোশাকের চলও ছিল, বিশেষত পুরুষদের পোশাকে। ঔপনিবেশিকতার ঘোর তখনও বেশ কিছুটা লেগে ভারতীয়দের সাজ পোশাকে। মহিলাদের ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করছেন, মহারানী গায়ত্রী দেবী, হিন্দি ছবির নার্গিস, নূতন-সুরাইয়ারা। বাংলায় অবশ্যই সুচিত্রা- সুপ্রিয়ারা।
ছয়ের দশক জুড়ে রাজ করল মধুবালার আনারকলি সালোয়ার, মুমতাজের কমলা শাড়ি, শর্মিলার ফাঁপানো খোঁপা। ছয়ের দশক যেন রং-এর দশক। এল গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানে বডি হাগিং সালোয়ার স্যুট, ছোট ব্লাউজ, ফোলানো খোঁপা। চোখের দুপাশে লম্বা টানা কাজল।
সাতের দশকে জনপ্রিয় হল ববি সিনেমায় ডিম্পলের পলকা ডটের ব্লাউজ আর হরেকৃষ্ণ হরেরামের জিনাত আমনের হিপি স্টাইল। পুভিন বাবির বিকিনি, আর হেলেনের ক্যাবারে পালকও তখন সুপারহিট। ক্রপড শার্ট, চোখের চাইতে বেশ বড় মাপের চশমা, প্ল্যাটফর্ম হিলো সে সময়কারই স্টাইল।
আটের দশকের স্টাইল সম্পূর্ণ অভিনব। পোশাক, এবং অ্যাকসেসরিজ-গয়নাতে এল জাঁক জমক, অবাধ্য চুল হয়ে উঠল ট্রেন্ডি। বলিউড দাপালেন শ্রীদেবী-রেখারা। রোহিত খোসলা থেকে সত্য পল, এই দশক জন্ম দিল প্রথম ভারতীয় পেশাদার ফ্যাশন ডিজাইনারদের। কস্টিউম ডিজাইনিং এর জন্য একমাত্র ভারতীয় হিসেবে এই দশকেই অস্কার জিতে লিনেল ভানু আথাইয়া।
নয়ের দশক জন্ম দিল আলিশা চিনয়ের মতো ইন্ডিপপ তারকাদের। বলিউডে তখন দিল তো পাগল হ্যায়, কুছ কুছ হোতা হ্যায় এর মতো ছবি। এই সময়ের বেশ কিছু ফ্যাশন স্টেটমেন্ট কিন্তু এখনো রয়ে গেছে অনেকটাই। ডেনিম শার্ট, ক্রপড টপ, চোকার, শিফন শাড়ি ভারতের ফ্যাশন মঞ্চে এ সবেরই আবির্ভাব গত শতাব্দীর শেষ দশকে। তখনকার ফ্যাশন আইকন বলতে কাজল, মাধুরী দীক্ষিত, করিশ্মা কাপুররা।
নতুন সহস্রাব্দ আমাদের দেশে নিয়ে এল আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের চল। নানা বহুজাতিক ফ্যশন ব্রান্ডের স্টোর খুলল দেশের মেট্রো শহরগুলোয়। করিশ্মার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বোন করিণাও হয়ে উঠল দেশের প্রথম সারির ফ্যাশন আইকন। 'পুহ', কিম্বা, যব উই মেট -এর গীত এর স্টাইল তখন উঠতি বয়সের কাছে দারুণ হিট।
গত দশক, মানে ২০১০-২০ এই সময়ের সবচেয়ে বড় বদল এনে দিল সোশ্যাল মিডিয়া। সারা দুনিয়াটা এখন গ্লোবাল ভিলেজ। দেশ-ভাষা-বর্ণ এসবের সঙ্গে ফ্যাশনের সম্পর্কটা আলগা হয়ে গেল প্রথম এই দশকেই। ব্র্যান্ড হয়ে উঠল ফ্যাশনের নির্ধারক। ফ্যাশনে এল স্পোর্টি লুক। ফ্যাশনে তারকা লুকের পাগলামিটাই আর রইল না। জনপ্রিয়তা পেল স্ট্রিট স্টাইল ফ্যাশন, ক্যাজুয়াল লুক।
এই দশক সবে শুরু। আর ফ্যাশন তো আসলে বৃহত্তর একটা সমাজেরই আয়না। এই দশকের চরিত্রটাই বদলে দিল অতিমারী। দীর্ঘ দেড় বছরে, বাড়ি থেকেই অফিস হয়ে উঠেছে নিউ নর্মাল। ফ্যাশনেও অতিমারীর ছায়া তো পড়বেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালো দেখায়, আর পরে আরাম, পোশাক বাছাইয়ের সময় এই দুটির কথা মাথায় রাখতে হয় এখন সবচেয়ে আগে। এ দশকের অনেকটা এখনও পড়ে, প্রায় আশি শতাংশ। সময় যেমন বদলাবে, তাল মিলিয়ে ফ্যশনও। আমাদের পরনের সাজ পোশাক আসলে ভবিষ্যতের ইতিহাসও বটে, সময়েরই দলিল।