লড়াইটা আজকের নয়। দীর্ঘদিনের। পুরুষ শাসিত সমাজের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। দেশ স্বাধীন হলেও দেশের মেয়েদের স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে আজও। ঘরের চার দেওয়াল থেকে কর্মক্ষেত্র। বাস-ট্রাম-রাস্তা সর্বত্রই এই লড়াই চলছে। খেলার জগতেও সেই একই বৈষম্য। নিজেদের অধিকার আর স্বপ্নপূরণের জন্য কঠিন লড়াইয়ের পথ বেছে নিতে হয়েছে মেরি কম থেকে হালের মীরাবাই চানুকে। স্বাধীনতার ৭৫ তম বর্ষে আমরা ফিরে দেখব তেমনই কিছু বীরাঙ্গনার লড়াই। যে লড়াই লক্ষকোটি ভারতীয়ের সাহস ও প্রেরণা।
রানী রামপাল এবং ভারতীয় হকি দল
টোকিও অলিম্পিকে মহিলা হকি দলের পারফরম্যান্সে উজ্জীবিত গোটা দেশ। বাস্তবের এই লড়াইকে বলিউডের সিনেমা 'চাক দে ইন্ডিয়া'র সঙ্গেও তুলনা করেছেন অনেকে। বাস্তবের এই লড়াইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র দলের অধিনায়ক রানী রামপাল। রানীর অধিনায়কত্বে গোটা দলের লড়াই অবাক বিস্ময়ে দেখেছে গোটা পৃথিবী।পুরোটাই যেন এক রূপকথার গল্প। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে চরম ব্যর্থতা থেকে ২০২১ এ এই সাফল্য। এরমধ্যেই লুকিয়ে আছে হার না না মানা এক কঠিন লড়াইের গল্প। লুকিয়ে যার অংশীদার মহিলা হকি দলের প্রতিটি সদস্য। ঘরে-বাইরে দুই লড়াই থেকেই ছিনিয়ে নিতে হয়েছে নিজেদের অধিকার।
মিতালি রাজ
বাইশ গজের যুদ্ধে মহিলা ক্রিকেটারদের লড়াইয়ের কথা বলতে গেলেই সামনে আসবে মিতালি রাজ এবং ঝুলন গোস্বামীর নাম। ক্রিকেটের মতো একটি জনপ্রিয় খেলার সঙ্গে দুজনে যুক্ত হলেও দুজনের জীবনেই জুড়ে আছে সামাজিক বঞ্চনা, দারিদ্রের সঙ্গে কঠিন লড়াই আর হাড়ভাঙা পরিশ্রম। এদের নেতৃত্বেই উঠে এসেছে স্মৃতি মান্ধানা, শেফালি ভার্মা, জেমি মাহের মতো একাধিক ট্যালেন্ট। মহিলাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মিতালির সর্বোচ্চ রান ও ক্যাপ রয়েছে। শচীন তেণ্ডুলকারের পর মিতালিই দ্বিতীয় ক্রিকেটার যিনি ২২ বছর ধরে ওয়ানডে খেলছেন। মিতালির নেতৃত্বেই ২০০৫ এবং ২০১৭ সালে আইসিসি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল।, ২০২০ সালে টি -টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালেও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটাররা
এমসি মেরি কম
সেরেনা উইলিয়ামস মা হওয়ার পর নানা বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। সন্তানের জন্ম দেওয়ার পরেই সেরেনার খেলার মান পড়ে গিয়েছে ,এমন সমালোচনাও হয়েছে বিশ্বখ্যাত এই টেনিস প্লেয়ারকে। ঠিক একই সমালোচনা সহ্য করেও অলিম্পিক থেকে বক্সিংয়ে সোনার পদক ছিনিয়ে এনেছিলেন মণিপুরের মেরি কম। তারপর একের পর এক সাফল্য। মেরি কমই একমাত্র মহিলা বক্সার যিনি ৬ বার ওয়ার্ল্ড অ্যামেচার চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন, একমাত্র বক্সার যিনি 8 টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। একমাত্র বক্সার ৬ বার এশিয়ান অ্যামেচার চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। চূড়ান্ত আর্থিক অনটন, ব্যঙ্গ,বিদ্রুপকে মুখ বুজে সহ্য করেই এই স্বপ্নের উড়ানে পাড়ি দিয়েছেন দেশের গর্ব মেরি কম।
সানিয়া মির্জা
ভারতের মহিলা টেনিস খেলোয়াড় হিসাবে আজ সবার কাছেই পরিচিত সানিয়া মির্জা। টেনিসের এই গ্ল্যামার কুইনকেও সহ্য করতে হয়েছে পুরুষ শাসিত সমাজের নানা তীর্যক মন্তব্য, বিদ্রুপ। তবু একরোখা সানিয়ার মনের জোরই ছিল সবথেকে বড় সম্পদ। সেই জোরেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ,ফ্রেঞ্চ ওপেন, উইম্বলডনে একের পর এক সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন সানিয়া। ঝুলিতে রয়েছে পদ্মভূষণ,পদ্মশ্রী,রাজীব গান্ধী খেলরত্নের মতো একাধিক পুরষ্কার
সাইনা নেহওয়াল এবং পিভি সিন্ধু
অলিম্পিকে পদক জয়ের পর পিভি সিন্ধুর জয়গান এখন দেশের কোনায় কোনায়।২০১৬ রিও অলিম্পিকে পুরো ,২০২০ টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ। ধারাবাহিক সাফল্যের মুকুট মাথায় পরেছেন দেশের এই ব্যাডমিন্টন তারকা।বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম সোনা আনার কৃতিত্বও জুড়ে রয়েছে সিন্ধুর সঙ্গে।
মহিলাদের ব্যাডমিন্টনে পিভি সিন্ধুর পাশাপাশিই আরও এক লড়াকু নাম সাইনা নেহওয়াল। সাইনার ঝুলিতেও রয়েছে একাধিক সাফল্যের খতিয়ান।সাইনাই প্রথম অলিম্পিকে ব্যাডমিন্টনে দেশকে পদক এনে দেন ২০১২ সালে। সাইনার হাত ধরেই ব্রোঞ্জ পদক এসেছিল দেশে।
দেশের বীরাঙ্গনাদের তালিকায় রয়েছে দীপিকা কুমারী, প্যাডলার মানিকা বাত্রা, তরুণ শ্যুটার মনু ভাকের সহ একাধিক নাম। পিটি উষা, কর্নম মালেশ্বরীরা যে সাফল্যের মশাল জ্বেলেছিলেন সেই মশালই বয়ে চলেছেন দেশের এই বীরাঙ্গনারা। স্বাধীনতা ৭৫ এ সবার জন্য রইল আমাদের শতকোটি কুর্নিশ