দুর্গাপুজো মানেই এখন থিমের চাকচিক্য । মণ্ডপ থেকে প্রতিমা...সবেতেই থিমের বাহার । হারিয়ে যাচ্ছে সাবেকিয়ানা । তবে, দুর্গাপুজো মানেই যে শুধু থিম বনাম সাবেকিয়ানা, তা নয়, দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, গল্পকথা । এডিটরজি বাংলায় আজ এমনই এক দুর্গাপুজোর কথা বলব, যার সঙ্গে জুড়ে প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো ইতিহাস, অজানা এক গল্প । ঝাড়গ্রাম থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজবাঁধের গুপ্তমণি । এখানেই রয়েছে মা গুপ্তমণির মন্দির । শবরদের দেবী গুপ্তমণি । তিনি দুর্গারূপে পূজিতা হন । কোনও পুরোহিত নয়, শবরদের হাতেই দেবী পূজিতা হন । কেউ তাঁকে বলেন বনদেবী, কেউ বলেন বনদুর্গা ।
মা গুপ্তমণি মন্দিরের পুজোর ইতিহাস
একসময় ঝাড়গ্রাম-সহ বেশ কিছু এলাকা ছিল রূপনারায়ণ মল্লদেবের বংশের অধীনে। তৎকালীন রাজা নিজের রাজ্যকে রক্ষার জন্য রাজপ্রাসাদ থেকে বেশ কিছু গুপ্ত রাস্তা বানিয়ে ছিলেন । একদিন সেই গুপ্ত রাস্তা দিয়ে তাঁর হাতি নিরুদ্দেশ হয় । হঠাৎ রাজামশাইকে মা স্বপ্ন দেন, যে তাঁর গুপ্ত রাস্তার পাশেই তাঁর অধিষ্ঠান । সুগনি বাসার বাসিন্দা শবর পরিবারের নন্দ ভক্তা তাঁকে সেখানে দীর্ঘদিন সেবা করে আসছেন । রাজার আদরের হাতি রয়েছে তাঁর কাছে। তিনি যেন নন্দলাল ভুক্তার কাছে যান । এরপর মায়ের স্বপ্নাদেশ মতো রাজামশাই সেখানে গিয়ে হাতি ফিরে পান । তারপর সেখানে মায়ের মন্দির গড়তে বলেন তিনি । তিনিই মন্দিরের নাম দেন 'গুপ্তমণি'। মা এখানে গুপ্তভাবে ছিলেন তাই মায়ের নাম গুপ্তমণি ।
ঝাড়গ্রামে দুর্গাপুজোর বৈশিষ্ট্য
গুপ্তমণি মন্দিরে দেবী গুপ্তমণি একটি পাথরে বিরাজমান । আলাদা করে মূর্তি গড়ে পুজো হয় না । চণ্ডীপাঠ হয় না । তৎকালীন শবর পরিবারের নন্দ ভক্তা যেভাবে পুজো করতেন ঠিক একই রকমভাবে এখনও শবররা পুজো করে আসছেন গুপ্তমণি দেবীর । দুর্গাপূজোর সময় এখানে ঘট বসিয়ে পূজো হয় । সন্ধ্যার সময় কোনও আলো নেই , শুধুই মোমবাতি আর প্রদীপ জ্বলে । স্থানীয়দের দাবি , মন্দিরের ভিতর বহুবার বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলেও,তা টেকেনি ।
বলিপ্রথারও প্রচলন রয়েছে । এছাড়া, গুপ্তমণি চত্বরে গেলেই দেখা যাবে, গাছে সুতো বাঁধা অবস্থায় ঝুলছে অজস্র হাতি ঘোড়ার মাটির মূর্তি । কথিত আছে, কারও কোনও কিছু হারিয়ে গেলে, হাতি ঘোড়ার মাটির মূর্তিতে সুতো বেঁধে দিয়ে মানসিক করলে, তা পরে ফিরে পাওয়া যায় । দেবী তুষ্ট থাকলে যে কোনও ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় । গত সাড়ে চারশো বছর ধরে নিয়ম রীতি মেনেই এখানে দুর্গারূপে পূজিতা হচ্ছেন গুপ্তমণি ।