আরজি করের ঘটনার পরেই ধৃত সঞ্জয় রায়কে যখন গ্রেফতার করা হয়, এবং নির্যাতিতার পোস্টমর্টেমের যে রিপোর্ট সামনে আসে তা থেকে সন্দেহ জোরালো হচ্ছিল এই ঘটনা কোনওভাবেই একজনের কাজ হতে পারে না। কিন্তু এর ভিত্তিতে কোনও তথ্য প্রমাণ সামনে আসেনি তখনও। তবে চিকিৎসক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সন্দেহ ছিল একাধিক ব্যক্তি এই ঘটনায় যুক্ত। কার্যত, সেই সন্দেহেই সিলমোহর পড়ল CBI -এর তদন্ত সূত্রে। নির্যাতিতার শরীরে প্রায় ২৪টি আঘাতের চিহ্ন পেয়েছেন তদন্তকারীরা। গণ পিটুনিতে যে ধরণের আঘাতের রূপ হয়, আরজি করে নির্যাতিতার ক্ষেত্রেও খানিকটা তেমনই ঘটেছে। এর থেকেই তদন্তকারীরা মনে করছেন, ধর্ষণ নয় ওই চিকিৎসককে খুন করে প্রধান লক্ষ ছিল আততায়ীদের। CBI-এও মনে করছে, ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনার গুরুত্ব অন্যদিকে ঘোরাতেই ধর্ষণের ঘটনাটিকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্রথম থেকেই তদন্তকারীদের দাবি, নির্যাতিতার ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ‘জল’ রয়েছে। ভিডিয়োগ্রাফির আবছা, ঝাপসা না না ছবিরই ফরেন্সিক টেস্ট হয়েছে। প্রমাণ লোপাটের যে চেষ্টা চলেছে, তার সূত্র জুড়ে জুড়ে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনের চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।
বাহ্যিক ১৫টি, দেহ ব্যবচ্ছেদের পর আরও ৯টি আঘাতের অভ্যন্তরীন চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে মৃতার ময়নাতদন্তে। অথচ দেহের পিছনের অংশের আঘাতের উল্লেখ কোথাও ছিল না।
তদন্তকারী এক অফিসারের কথায়, “বার বার প্রবল ভাবে মৃতার গলা টিপে ‘থাইরয়েড কার্টিলেজ’ গুরুতর জখম করার আভাস মিলছে। সাংঘাতিক গণপিটুনির শিকার হয়েছেন তিনি। এত জোরে তাঁকে চেপে ধরা হয়েছে যে নাক, মুখ ,চোখ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। এছাড়া তদন্তকারীদের দাবি, মৃতদেহের নীচে নীল রঙের তোয়ালের মতো একটি কাপড়ও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সেমিনার কক্ষটির ‘ক্রাইম সিন’ও নাকি নির্যাতিতার আঘাতের চিহ্নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
উল্লেখ্য, সংবিধান অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর ময়নাতদন্ত করার নিয়ম নেই। কিন্তু একান্তই ময়নাতদন্ত করতে গেলে, উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র লাগে। গত ৯ অগাস্ট আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত মহিলা চিকিৎসকের দেহে ময়নাতদন্ত কেন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে এই নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সিবিআইয়ের এক তদন্তকারী আধিকারিক জানিয়েছেন, সেদিন রাতেই নিহত চিকিৎসকের ময়নাতদন্ত করিয়েই দাহ করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের কোনও সুযোগ পাননি তদন্তকারীরা। এই নিয়ে প্রভাবশালীর চাপ ছিল বলে সন্দেহ করছেন সিবিআই আধিকারিকরা।
সিবিআই আধিকারিকদের দাবি, মৃতদেহ যাতে কোনও ভাবেই ময়নাতদন্ত করা না যায়, বা প্রকারান্তরে প্রমাণ লোপাট করা যায়, তাই তড়িঘড়ি দাহ করে দেওয়া হয়েছে। সিবিআইয়ের এক কর্তার কথায়, "মৃতার মা, বাবা-ও দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের অনুরোধও করেছিলেন। না হলে আরজি করে রাতেই মৃতদেহ সংরক্ষণ করা যেত। কিন্তু পুলিশ রাতেই দাহকাজ সারতে মরিয়া হয়ে ওঠে।"
কোন প্রভাবশালীর নির্দেশে অভিজিৎ মণ্ডল ও মামলার তদন্তকারী অফিসার কীভাবে ময়নাতদন্ত নিয়ে অতি সক্রিয় হয়ে উঠলেন, তা এখন খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে সিবিআই। তাতে কিছু জরুরি তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। মৃতদেহ উদ্ধারের দিন সবাই যে আরজি কর হাসপাতালে ছিলেন, এমনও ভাবতে চাইছে না কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সিবিআই আধিকারিকদের অনুমান, অনেকেই নেপথ্যে ছিলেন। সেই চরিত্র কারা! তাদের ভূমিকা কী ছিল! প্রমাণ লোপাটে কারা সক্রিয় ছিল! আরজি করের খুন ও ধর্ষণের তদন্তে নেমে এটা বের করাও সিবিআইয়ের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে আদালতে গ্রহণযোগ্য কোনও নথি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে সিবিআই।