সন্দেশখালি। নতুন বছরের পাঁচই জানুয়ারি। রাজ্যের রেশন দুর্নীতির তদন্তে আর পাঁচ জায়গা যাওয়ার মতোই বাংলার এই প্রান্তিক জনপদে তল্লাশিতে গেল কেন্দ্রীয় এজেন্সি ইডি। কলকাতা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে তারা হাজির হল অখ্যাত এক এলাকায়। নাম আঙ্কুঞ্জি পাড়া। এই পাড়ার এক বাসিন্দার নাম শাহজাহান শেখ। ইডির খাতায় সে অভিযুক্ত।
বেলা গড়াতেই শুরু ধুন্ধুমার। সেই প্রথম, রাজ্যে দুর্নীতির তদন্তে গিয়ে আক্রান্ত কেন্দ্রীয় এজেন্সি। গ্রামবাসীদের তাড়ায় আহত ইডির চার অধিকর্তা। এরপর উত্তেজনার ৫৪ দিন। কেন্দ্র, রাজ্য, রাজনৈতিক দল, আদালত সব জায়গায় একটাই আলোচনা। সন্দেশখালি। মেঘের আড়ালে শাহজাহান। আর এসবের মধ্যেই সামাজিক পালাবদল শুরু বসিরহাটের।
শাসকের নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, প্রতিবাদ, জনরোষে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেষা উত্তরের এই জনপদের সঙ্গে তুলনা করা হল নন্দীগ্রামের। একদা শান্ত সন্দেশখালিকে দেখে বাংলার মনে পড়ে গেল লালগড়, কেশপুর, পিংলার কথা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুরু বাহিনীর রুট মার্চ। আর এর মধ্যেই শাহজাহানের খোঁজে তদন্ত শুরু করল রাজ্য। এলাকায় ঢুকতে গিয়ে পুলিশি বাধায় ডান-বাম। ধরপাকড়ে জালে ধরা পড়ল শাসক দলের নেতা। গ্রেফতার করা হল রাজ্যের প্রাক্তন বিধায়ককেও।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সন্দেশখালিই এবার বসিরহাটের লোকসভা ভোটের ফ্যাক্টর। কারণ এই কেন্দ্রেও জড়িয়ে রয়েছে জোর জমি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ, মহিলাদের উপর অত্যাচারের। আদালতের নির্দেশে যার তদন্ত করছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি সিবিআই। আর এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে এবার বসিরহাট শাসকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চায় বিরোধীরা।
অবশেষে ৫৪ দিনের টানাপোড়েন শেষ। রাজ্যের তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমারের রাতভর টহলের পর জালে শাহজাহান। কার্যত স্বস্তি ফিরল ইছামতীর ধারে। বিরোধী শিবিরে উল্লাস। শাহজাহানকে বহিষ্কার করে রাজধর্ম পালন করল শাসক দল। আর এই আবহে তৈরি হয়ে গেল বসিরহাটের লোকসভার ভোট ময়দান।
স্বাধীনতার পর থেকেই বসিরহাট কখনও বাম আবার কখনও কংগ্রেসের। ১৯৮০ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত এই কেন্দ্র ছিল সিপিআইয়ের দূর্গ। শুরু করেছিলেন ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত। ধারা বজায় রেখেছিলেন অজয় চক্রবর্তী। মূলত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই এলাকায় পালাবদল ২০০৯ সংখ্যালঘু প্রার্থীকে মুখ করে প্রথম সাফল্য তৃণমূলের। লোকসভায় গেলেন হাজি নুরুল।
যাদবপুরের সঙ্গে খানিক মিল রয়েছে এই বসিরহাটের। কারণ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই কেন্দ্রের মতোই গত তিন লোকসভায় মুখ বদলেছে উত্তর ২৪ পরগনার এই কেন্দ্রে। হাজি নুরুলের পর এই কেন্দ্র থেকেই সাংসদ ইদ্রিশ আলি এবং নুসরত জাহান। ২০১৯ সালের ভোটে এই কেন্দ্র থেকে রেকর্ড সাড়ে ৩ লক্ষ ভোটে জয় নুসরতের।
কিন্তু সন্দেশখালির ঘটনা বর্তমানে বদলে দিয়েছে এই কেন্দ্রের সব হিসাব। শাহজাহান-কাণ্ডে কোপ পড়েছে নুসরতের উপর। ফের এই কেন্দ্রে তৃণমূল ফিরিয়ে এনেছেন হাজি নুরুলকে। বিজেপির মুখ সন্দেশখালির প্রতিবাদী রেখা পাত্র। যাঁকে ইতিমধ্যেই মা দুর্গার সঙ্গে তুলনা করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
তবে এবার বসিরহাট নিয়ে আলাদাভাবে স্বপ্ন দেখছেন বামেরা। সন্দেশখালির ঘটনায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেই আলিমুদ্দিন স্থির করে ফেলে এই কেন্দ্র উদ্ধারে তাদের মুখ নিরাপদ সর্দার। এবার নিরাপদই বামেদের বসিরহাট বৈতরণীর ভরসা। যাঁর নেতৃত্বেই সন্দেশখালিতে ফের উড়েছিল লাল-পতাকা।
চার জুন ইভিএম খুললে কোন পতাকা উড়বে ? প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলের। কারণ, তিন বছর আগে রাজ্যের বিধানসভা ভোটে এই কেন্দ্রের সাত বিধানসভায় ফুটেছিল ঘাসফুল। বারাসত, বনগাঁ, বারাকপুরের মতো এই বসিরহাটও এখন দূর্গ তৃণমূলের। সেই দূর্গে কে ফাটল ধরাবে ?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে বসিরহাটের এই জনপদ দেখল এক নতুন ছবি। দেখল একবিংশ শতকের প্রযুক্তির ছবি। এতদিন ইডি, সিবিআইয়ের তল্লাশির সাক্ষী ছিল এই এলাকা। এবার ন্যাশানল সিকিউরিটি গার্ডের বুটের শব্দে এক নতুন আওয়াজ অনুভব করল, সেই সন্দেশখালি।